
মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ক্রিকেট দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ভারতের তরুণ ব্যাটার বৈভব সূর্যবংশী। অল্প সময়ের আইপিএল ক্যারিয়ার হলেও এরই মধ্যে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এখন পর্যন্ত মাত্র ১০ ম্যাচ খেলেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এই কিশোর ক্রিকেটার। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটেও তার ঝুলিতে রয়েছে একাধিক উল্লেখযোগ্য রেকর্ড, যা তাকে ভবিষ্যতের বড় তারকা হিসেবে ভাবতে বাধ্য করছে ক্রিকেটপ্রেমীদের।
সম্প্রতি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিপক্ষে সূর্যবংশীর একটি ঝড়ো ইনিংস নতুন করে তাকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। মাত্র ১৪ বলে ৩৯ রানের ইনিংসটি ছিল আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং প্রতিভার এক অনন্য উদাহরণ। বিশেষ করে ইনিংসের শুরুতেই বিশ্বের অন্যতম সেরা পেসার জাসপ্রিত বুমরাহ’র বলে লং-অনে ছক্কা হাঁকানো তার মানসিক দৃঢ়তা এবং বড় মঞ্চে ভয়হীন মানসিকতারই পরিচয় দেয়।
সূর্যবংশীর ব্যাটিং স্টাইল নিয়ে ইতোমধ্যেই ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তার ব্যাকলিফট বা শট খেলার আগে ব্যাটকে অনেক উঁচুতে তুলে নেওয়ার অভ্যাস নিয়ে নানা মত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের ব্যাটিং কৌশল দ্রুতগতির বোলিংয়ের বিপক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে তার কোচ জুবিন ভারুচা এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। বরং তিনি মনে করেন, এই ব্যাকলিফটই সূর্যবংশীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
ভারুচার মতে, উঁচু ব্যাকলিফট একজন ব্যাটসম্যানকে অতিরিক্ত সময় এবং জায়গা তৈরি করতে সাহায্য করে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এটি দেরিতে শট খেলার কারণ হতে পারে বলে মনে করা হয়, কিন্তু সূর্যবংশীর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তার ব্যাট সুইং এমনভাবে কাজ করে, যা তাকে বল মোকাবিলায় বাড়তি সময় দেয়। ফলে দ্রুতগতির বোলারদের বিপক্ষেও সে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারে। তার এই ব্যাটিং বৈশিষ্ট্যই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
কোচের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের সময় সূর্যবংশীর একটি উত্তর বিশেষভাবে নজর কেড়েছিল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ট্রায়াল দিতে এসে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কার ভক্ত—তখন তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে জানান, তার আদর্শ ব্রায়ান লারা। এই উত্তর শুনে বিস্মিত হন কোচ নিজেও। কারণ, সূর্যবংশীর জন্মের আগেই প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল লারার ক্যারিয়ার। তবুও একজন তরুণ ক্রিকেটারের মধ্যে এমন সচেতনতা এবং ক্রিকেটীয় অনুপ্রেরণা বিরল বলেই মনে করা হয়।
তবে সূর্যবংশীর ব্যাটিংয়ে শুধু লারার প্রভাবই নয়, আরও দুই কিংবদন্তি ভারতীয় ব্যাটার শচীন টেন্ডুলকার এবং রাহুল দ্রাবিড়ের ছাপও দেখা যায়। তার মাথার পজিশন অনেকটা শচীনের মতো, যেখানে বল সবসময় চোখের লাইনের মধ্যে থাকে। এর ফলে অফ-স্টাম্পের বলও সে সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আবার তার কব্জির ব্যবহার এবং ব্যাট নামানোর গতি দ্রাবিড়ের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা তাকে বিভিন্ন ধরনের শট খেলতে সহায়তা করে।
তবে সব শক্তির পাশাপাশি সূর্যবংশীর কিছু দুর্বলতাও রয়েছে, যা নিয়ে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইনসুইং বল, যা স্টাম্পের দিকে ঢুকে আসে, সেটি মোকাবিলায় কিছুটা সমস্যা দেখা যায় তার। এক ম্যাচে এমন একটি ডেলিভারিতে সমস্যায় পড়ার পর নিজেই স্বীকার করেছেন যে, প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। এই জায়গাটিতেই এখন বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন তার কোচ এবং প্রশিক্ষকরা।
সূর্যবংশীর ব্যাটিং মূলত নির্ভর করে টাইমিং এবং রিদমের ওপর। যখন এই দুটি বিষয় ঠিকঠাকভাবে মিলে যায়, তখন তার ব্যাটিং হয়ে ওঠে চোখধাঁধানো। তবে কখনো কখনো এই সমন্বয় নষ্ট হলে ভুল শট খেলা বা আউট হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। তাই ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই এখন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
গত ছয় মাসে নিজের ব্যাটিংয়ে বেশ কিছু উন্নতি এনেছেন সূর্যবংশী। বিশেষ করে শর্ট বল খেলার ক্ষেত্রে আগের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছেন অনেকটাই। আগে যেখানে শর্ট বল টানতে গিয়ে টপ-এজ হয়ে আউট হতেন, এখন সেখানে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ এবং আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে। শরীরের কাছাকাছি বল এনে খেলার অভ্যাস তার ব্যাটিংকে আরও পরিণত করেছে।
চলতি আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে তার পারফরম্যান্সও দারুণ। তিন ম্যাচে প্রায় ২৪৯ স্ট্রাইকরেট এবং ৪০.৬৬ গড়ে ১২২ রান করে ইতোমধ্যেই নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন তিনি। এত কম বয়সে এমন পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের জন্য বড় ইঙ্গিত বহন করে।
সবকিছু মিলিয়ে বৈভব সূর্যবংশী এখন ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রতিভা। লারাকে আদর্শ মেনে যাত্রা শুরু করা এই তরুণ ব্যাটার নিজের খেলায় শচীন ও দ্রাবিড়ের গুণও আয়ত্ত করার চেষ্টা করছেন। যদি তিনি নিজের উন্নতির এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় কিছু করে দেখানো তার জন্য অসম্ভব নয় বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।
মন্তব্য করুন