
দেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে আধুনিক, কার্যকর এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে একটি বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডেটাভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা জোরদারে সমন্বিত ডেটা ওয়্যারহাউজ (Integrated Data Warehouse–IDW) প্রতিষ্ঠার মহাপরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান, বিশ্লেষণ এবং প্রকাশনা কার্যক্রম আরও সহজ, দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো একটি কেন্দ্রীয়, নিরাপদ এবং আন্তঃসংযোগযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান ডেটা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। এর ফলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা ডেটা একক কাঠামোর অধীনে আনা সম্ভব হবে। এতে করে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া হবে আরও তথ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ এবং কার্যকর।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন অ্যাজেন্সি (KOICA) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) যৌথভাবে। প্রকল্পটির নাম ‘ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অব স্ট্যাটিসটিকস সার্ভিস বেইজড অন প্ল্যাটফর্ম (২০২৩–২০২৬)’। প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৯.৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের পরিসংখ্যান খাতের ডিজিটাল রূপান্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই মহাপরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন অ্যাজেন্সির (KOICA) বাংলাদেশ কার্যালয়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) মহাপরিচালক মো: ফরহাদ সিদ্দিক, এবং বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশনসহ বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের জন্য একটি আধুনিক ডেটা অবকাঠামো তৈরি করা হবে, যেখানে সব ধরনের সরকারি পরিসংখ্যান একক প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা যাবে। এটি হবে একটি কেন্দ্রীয় ডেটা হাব, যা বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়কে সহজ করবে এবং ডেটার পুনরাবৃত্তি বা অসামঞ্জস্যতা কমাবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে KOICA’র কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম বলেন, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের পথে একটি রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ। তার মতে, একটি শক্তিশালী ডেটা অবকাঠামো ছাড়া প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ সম্ভব নয়। তাই এই প্রকল্প ভবিষ্যতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, কোইকা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে একটি আধুনিক, নির্ভরযোগ্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর ডেটা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পেরে গর্বিত। ভবিষ্যতেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে এবং প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক মো: ফরহাদ সিদ্দিক বলেন, এই মহাপরিকল্পনা দেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। এটি একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে, যা উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে ডেটা ব্যবস্থাপনায় কিছু অসামঞ্জস্যতা ও বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেই সমস্যা অনেকাংশে সমাধান হবে এবং ডেটার মান, নির্ভরযোগ্যতা ও প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সমন্বিত ডেটা ওয়্যারহাউজ চালু হলে সরকারের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। কারণ তখন সিদ্ধান্তগুলো আরও বেশি বাস্তব তথ্য ও বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে পরিকল্পনা গ্রহণেও দ্রুততা ও স্বচ্ছতা বাড়বে।
এছাড়া এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলো সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারবে। এতে করে গবেষণার গুণগত মান বাড়বে এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন পক্ষ এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে ডেটা-নির্ভর শাসন ব্যবস্থার বিকল্প নেই। আর এই মহাপরিকল্পনা সেই দিকেই একটি বড় পদক্ষেপ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সমন্বিত ডেটা ওয়্যারহাউজ প্রকল্প দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নই নয়, বরং একটি দক্ষ, স্বচ্ছ এবং তথ্যভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করবে, যা ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য করুন