
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি এবং টিকার ঘাটতি নিয়ে জাতীয় সংসদে তীব্র আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সমালোচনা করেন। তিনি জানান, গত সাড়ে পাঁচ বছরে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং টিকা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে বর্তমানে শিশুরা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন।
আলোচনার শুরুতেই আখতার হোসেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের বিস্তার, বিশেষ করে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক জায়গায় ৬ মাস বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ও আইসিইউ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কথাও তিনি সংসদের নজরে আনেন।
এর জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সাধারণত প্রতি চার বছর পরপর হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করার কথা থাকলেও গত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে এ ধরনের কোনো বড় ক্যাম্পেইন হয়নি। ফলে একটি বড় সংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। বর্তমানে যেসব এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব বেশি, সেসব জায়গায় মূলত টিকাবঞ্চিত শিশুদের সংখ্যাই বেশি।
তিনি আরও জানান, অতীতের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হয়। এর ফলে শুধু হামের টিকাই নয়, আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টিকার মজুতেও সংকট দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে বর্তমান সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ৫ এপ্রিল থেকে দেশের নির্দিষ্ট কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১৮টি জেলা এবং ৩০টি উপজেলায় এই কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম ধাপে প্রায় ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। কর্মসূচির প্রথম দিনেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৬ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে, যা সরকারের প্রস্তুতি ও কার্যক্রমের ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, এই কর্মসূচি ধাপে ধাপে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও সম্প্রসারণ করা হবে। ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে এবং ৩ মে থেকে দেশের অবশিষ্ট অংশেও তা চালু করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো নিয়ে তিনি জানান, দেশের সব সরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় আক্রান্তের হার বেশি, সেখানে অতিরিক্ত আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হচ্ছে। রাজশাহী অঞ্চলে নতুন করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আইসোলেশন বেড সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি কম খরচে কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় একটি সাশ্রয়ী অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় সহায়ক হবে।
সংসদে আলোচনার এক পর্যায়ে আখতার হোসেন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি দাবি করেন, কাগজে-কলমে নানা পরিকল্পনা থাকলেও সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে না। আইসোলেশন বা আইসিইউ সুবিধার ঘাটতির কথাও তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন।
এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, প্রতিবছর বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ থাকলেও তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় না হয়ে থেকে যায়, যা কার্যকর পরিকল্পনার অভাবকে নির্দেশ করে।
এই বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সময়ের কিছু অব্যবহৃত অর্থ এখন টিকা সংগ্রহে ব্যবহার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় অতিরিক্ত টিকা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ঘাটতি না থাকে।
তিনি আরও জানান, মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি জোরদার করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে টিকাদান কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে, হামের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একদিকে যেমন জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে টিকা সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে এবং শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা আরও নিশ্চিত করা যাবে।
মন্তব্য করুন