Mojammmal Fahad
১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

হানি কম্বো একসাথে চারটি ভিন্ন স্বাদের মধু (Honey Combo)

হানি কম্বো একসাথে চারটি ভিন্ন স্বাদের মধু (Honey Combo)

হানি কম্বো একসাথে চারটি ভিন্ন স্বাদের মধু (Honey Combo)

হানি কম্বো একসাথে চারটি ভিন্ন স্বাদের মধু (Honey Combo)

স্মৃতির পাতায় ফেলে আসা নববর্ষ

স্মৃতির পাতায় ফেলে আসা নববর্ষ
স্মৃতির পাতায় ফেলে আসা নববর্ষ

পহেলা বৈশাখ এলেই মনটা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যায়। চারপাশে লাল-সাদা সাজ, শহরের রঙিন আয়োজন, উৎসবের ভিড়—সবকিছুর মাঝেও কোথাও একটা শূন্যতা কাজ করে। মনে পড়ে যায় সেই ফেলে আসা দিনগুলোর কথা, যখন বৈশাখ মানেই ছিল নিখাদ আনন্দ, সরলতা আর গ্রামীণ জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব। আজকের ব্যস্ত নগরজীবনে দাঁড়িয়ে সেই দিনগুলোর কথা ভাবলেই মনটা নস্টালজিয়ায় ভরে ওঠে।

শৈশবের নববর্ষ শুরু হতো চৈত্রের শেষ দিক থেকেই। গ্রামজুড়ে তখন এক অদ্ভুত প্রস্তুতির আবহ তৈরি হতো। বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার ধুম পড়ে যেত। উঠোনে নতুন করে মাটি দিয়ে নিকোনো হতো, ঘরের প্রতিটি কোণ ঝকঝকে করে তোলা হতো। সেই নিকোনো মাটির সোঁদা গন্ধ যেন নতুন বছরের আগমনী বার্তা বয়ে আনত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই কাজে অংশ নিত—এ যেন এক অলিখিত সামাজিক ঐক্যের প্রতিচ্ছবি।

চৈত্র সংক্রান্তির দিন ভোরবেলা শুরু হতো এক বিশেষ রীতির মধ্য দিয়ে। বাড়ির বড়রা বসে থাকতেন উঠোনে, আর ছোটদের ভোরে উঠে পুকুরে গিয়ে গোসল করতে হতো। গোসল শেষে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হতো, আর তারা হাতে তুলে দিতেন কাঁচা হলুদ। সেই তেতো স্বাদের কাঁচা হলুদ খাওয়া যেন ছিল এক ধরনের শুদ্ধতার প্রতীক—পুরোনো বছরের সব মলিনতা দূর করে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর এক প্রতীকী আয়োজন।

সেই দিনটিতে আরও নানা রকম গ্রামীণ রীতি ছিল। রান্নাঘরের কোণে পেঁয়াজ-রসুন বেঁধে রাখা হতো, পুরোনো গাছপালা উপড়ে ফেলা হতো। এগুলোর মধ্যে লুকিয়ে ছিল নতুনের জন্য জায়গা করে দেওয়ার এক গভীর দর্শন। সকালের খাবার হতো খুবই সাধারণ—চাল-কলাই ভাজা, কখনো নারকেল। কিন্তু সেই খাবারের স্বাদ ছিল অসাধারণ, কারণ সেটি ছিল সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দের অংশ।

দুপুরের পর গ্রামের পুরুষেরা দল বেঁধে বের হতেন মাছ ধরতে। কেউ জাল নিয়ে, কেউ পলো নিয়ে ছুটতেন পাশের বিল বা নদীতে। মাছ ধরার সেই সম্মিলিত আয়োজন ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল—মাছ ধরা শেষে তা ভাগ করে দেওয়া হতো গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে, উপস্থিত থাকুক বা না থাকুক। এই ভাগাভাগির সংস্কৃতি আজকের দিনে খুব কমই দেখা যায়।

পরদিন পহেলা বৈশাখ। বছরের প্রথম দিনটি ছিল বিশেষ নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে বাঁধা। একটি প্রচলিত বিশ্বাস ছিল—এই দিনে প্রথম খাবার অন্যের বাড়িতে খেলে সারা বছর পরনির্ভর হয়ে থাকতে হবে। তাই সবাই নিজ নিজ বাড়িতেই খেত। আর বাসি খাবার খাওয়ার ওপর ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। প্রতিটি বাড়িতে রান্না হতো গরম ভাত, সঙ্গে সাধ্যের মধ্যে তরকারি। সেই গরম ভাতের ধোঁয়া আর পরিবারের সবার একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ—এটাই ছিল নববর্ষের আসল সৌন্দর্য।

আজকের মতো তখন পান্তা-ইলিশের জৌলুস ছিল না। গ্রামে তখন বিদ্যুৎ ছিল না, খাবার সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল সীমিত। তাই বৈশাখ মানেই ছিল তাজা খাবার, সরল রান্না আর পারিবারিক মিলনমেলা। নতুন পোশাকের বাড়াবাড়িও ছিল না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড়ই ছিল সবার কাছে সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।

বিকেলের দিকে জমে উঠত বৈশাখী মেলা। খোলা মাঠে বসত সেই মেলা, যেখানে ছোট-বড় সবাই ভিড় করত। মাটির খেলনা, মিঠাই, মণ্ডা, নানা রকম পসরা—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল মাটির তৈরি খেলনা, আর বড়দের জন্য ছিল হালখাতার আয়োজন। দোকানিরা নতুন খাতা খুলে পুরোনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নিতেন, আর অতিথিদের আপ্যায়ন করতেন মিষ্টি দিয়ে। এই হালখাতার সংস্কৃতি ছিল ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক সম্পর্কেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাতে বাড়ি ফিরে যখন শিশুদের খেলনা গাড়ির ট্যাং ট্যাং শব্দ শোনা যেত, তখন বোঝা যেত—আজ বৈশাখী মেলায় ঘুরে এসেছে সবাই। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ছিল শৈশবের সবচেয়ে বড় আনন্দ।

বর্তমান সময়ের নববর্ষ উদযাপন অনেকটাই বদলে গেছে। শহুরে জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন আয়োজন—বড় বড় শোভাযাত্রা, ফ্যাশন, খাবারের বাহারি আয়োজন। তবে এই আধুনিকতার ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই সরলতা, আন্তরিকতা আর পারিবারিক বন্ধনের উষ্ণতা।

ফেলে আসা সেই নববর্ষ আমাদের শেখায়—উৎসবের আসল আনন্দ বাহ্যিক জাঁকজমকে নয়, বরং মানুষের মধ্যে সম্পর্ক, ভালোবাসা আর ভাগাভাগির মধ্যে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কোথা থেকে এসেছি এবং আমাদের সংস্কৃতির শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত।

সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসবেই, সেটাই স্বাভাবিক। তবে সেই পরিবর্তনের মাঝেও যদি আমরা আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর শৈশবের সরল আনন্দগুলোকে ধরে রাখতে পারি, তাহলেই হয়তো নববর্ষের প্রকৃত অর্থকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে। ফেলে আসা নববর্ষ তাই শুধু স্মৃতি নয়—এটি আমাদের শেকড়ের সঙ্গে সংযোগের এক জীবন্ত দলিল।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইন্দোনেশিয়ায় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা, ৮ আরোহীর মর্মান্তিক মৃত্যু

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, বাংলাদেশে ফিরছে অস্ট্রেলিয়া

সবজির বাজারে আগুন, অধিকাংশের দাম ১০০ টাকার ওপরে

সাংগ্রাই জলকেলিতে উচ্ছ্বাসে ভাসলেন মারমা তরুণ-তরুণীরা

জিলকদ মাসের চাঁদ দেখতে শনিবার বৈঠকে বসছে কমিটি

অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে এয়ারলাইন্স খাতের গুরুত্ব বাড়ছে

তামিম সভাপতি হওয়ার পর মিরাজের সঙ্গে কী আলোচনা?

সংঘাতের মাঝেই ইসরায়েল-লেবানন আলোচনায় বসছে, আশাবাদী ট্রাম্প

অক্সিজেন আর ক্যানুলায় ভর করে বেঁচে থাকার লড়াই শিশুদের

আ.লীগ আমলের রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে উদ্যোগ

১০

হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, এক মাসে ১৯৮ শিশুর মৃত্যু রেকর্ড

১১

ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন উদ্যোগ, ডেটা ওয়্যারহাউজ প্রকল্প ঘোষণা

১২

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বমন্দার আশঙ্কা, সতর্ক করল আইএমএফ

১৩

ইসরাইলি ঘাঁটিতে হিজবুল্লাহর ক্রুজ মিসাইল হামলা, বৈরুতে তীব্র প্রতিবাদ

১৪

ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬: ফের আর্থিক খাতে লুটপাটের আশঙ্কা

১৫

লাইভস্ট্রিমে ভিউ বাড়লেই কমবে বিজ্ঞাপন, নতুন ঘোষণা ইউটিউবের

১৬

সংবিধান পরিবর্তনে নতুন সমঝোতা, একসঙ্গে সরকার-বিরোধী দল

১৭

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় এ ইউনিটের ফল প্রকাশ, ফেল করেছে ৭০%

১৮

স্মৃতির পাতায় ফেলে আসা নববর্ষ

১৯

শৈশবের বৈশাখ: মায়ের শাড়ি থেকেই জামা বললেন বানাতেন পরীমণি

২০