
দেশে হামের প্রকোপ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গত এক মাসে সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৯৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জন শিশুর এবং সন্দেহভাজন হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৬৬ জনের। একই সময়ে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৩৯৮ জন শিশু এবং নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৯৭৩ জন।
এই উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে বুধবার (১৫ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হিসাব ১৫ মার্চ সকাল ৮টা থেকে ১৫ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। শুধুমাত্র এই বিভাগেই এক মাসে হাম ও সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৪ জন শিশুর। একই সময়ে এই বিভাগে আক্রান্ত হয়েছে ১০ হাজার ৩০ জন শিশু, যা দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় অনেক বেশি।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। এখানে এক মাসে হাম ও সন্দেহভাজন হামে মৃত্যু হয়েছে ৬৭ জন শিশুর এবং আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৫৫৬ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনঘনত্ব, চিকিৎসা সুবিধার চাপ এবং টিকাদান কাভারেজের তারতম্যের কারণে এই দুই বিভাগে সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, সবচেয়ে কম সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে রংপুর বিভাগে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই বিভাগে গত এক মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৬৪৪ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে। তবে আশার বিষয় হলো, এই সময়ে রংপুর বিভাগে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
গত ২৪ ঘণ্টার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই সময়ে সারাদেশে নতুন করে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১ জন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৭৬ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের এই দ্রুত বিস্তার একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকেত হিসেবে দেখা উচিত। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে টিকাদানের ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তাদের মতে, হামের মতো সংক্রামক রোগ সাধারণত টিকা গ্রহণের মাধ্যমে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু যদি টিকাদান কার্যক্রমে কোনো ঘাটতি থাকে, তাহলে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা এবং হাসপাতালগুলোতে আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তাই অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
সব মিলিয়ে, এক মাসের এই পরিসংখ্যান দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরও সমন্বিত ও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখন সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন