
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর একটি বড় উদাহরণ দেখা যাচ্ছে নেপালে, যেখানে নতুন প্রজন্ম দ্রুত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশেও তরুণদের আন্দোলন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও তা এখনো শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
সম্প্রতি নেপালে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন বালেন্দ্র শাহ। তরুণ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেকের কাছে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের তরুণ আন্দোলন সরকার পরিবর্তনে প্রভাব ফেললেও তা সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারেনি।
বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক নির্বাচনে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বড় জয় অর্জন করে। বিপরীতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এতে স্পষ্ট হয় যে, আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
অন্যদিকে নেপালে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) অল্প সময়ের মধ্যেই জনগণের আস্থা অর্জন করে এবং নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য পায়। এর ফলে অনেক তরুণ সরাসরি সংসদে প্রবেশের সুযোগ পায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ।
নেপালের রাজনৈতিক কাঠামোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে জোটভিত্তিক সরকার গঠনের প্রবণতা থাকায় নতুন দলের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর প্রতি জনগণের অসন্তোষ বাড়ায় নতুন রাজনৈতিক শক্তি সহজেই গ্রহণযোগ্যতা পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। এখানে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী সংগঠন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক নতুন দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ফলে নতুন রাজনৈতিক শক্তির দ্রুত প্রতিষ্ঠা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নেপালে আন্দোলনের অল্প সময়ের মধ্যেই নির্বাচন হওয়ায় সেই গতি বজায় থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে আন্দোলন ও নির্বাচনের মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান থাকায় তরুণদের সংগঠিত শক্তি দুর্বল হয়ে যায়।
এছাড়া রাজনৈতিক কৌশলগত কিছু সিদ্ধান্তও প্রভাব ফেলেছে। নতুন দলগুলোর জোটনীতি এবং অবস্থান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় তারা সম্ভাব্য অনেক সমর্থন হারায়। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি অংশ দূরে সরে যায়।
তবে সবকিছুর পরও বাংলাদেশের তরুণদের আন্দোলন পুরোপুরি ব্যর্থ নয়। এই আন্দোলন রাজনৈতিক সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
বর্তমানে অনেক তরুণ রাজনীতি নিয়ে হতাশ হয়ে বিদেশমুখী হলেও বিশ্লেষকদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী সংগঠন এবং জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংযোগ গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে তরুণ নেতৃত্ব আবারও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নেপাল ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় পরিষ্কার করে— আন্দোলন শুরু করা যতটা সহজ, সেটিকে টেকসই রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া ততটাই কঠিন। তবে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা দুই দেশেই রয়েছে, যা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ভাষান্তর: সোহানুর রহমান
মন্তব্য করুন