
দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬’ ঘিরে। আইনটি প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্বল ও সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, একীভূতকরণ এবং আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করা। কিন্তু আইনটি সংসদে পাস হওয়ার পর এর কিছু ধারা নিয়ে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে একটি নতুন সংযোজিত ধারা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা অনেকের মতে ব্যাংক খাতে আবারও অনিয়ম ও লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে এই খাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এখানে কোনো ধরনের দুর্বলতা বা অনিয়ম পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গত এক দশকে বিভিন্ন অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক মারাত্মক সংকটে পড়ে। কিছু ব্যাংক টিকে আছে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা এবং সরকারি প্রণোদনার ওপর নির্ভর করে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংক খাতকে পুনর্গঠন করার জন্য একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়নের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের একটি অধ্যাদেশে ব্যাংক পুনর্গঠন ও একীভূতকরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সেই অধ্যাদেশের লক্ষ্য ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সঠিকভাবে পুনর্গঠন করা এবং যেসব গোষ্ঠী অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে বিপদে ফেলেছিল, তাদের পুনরায় মালিকানায় ফিরে আসার পথ বন্ধ করা।
তবে নতুন আইনটি পাস হওয়ার পর দেখা যায়, এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা হয়েছে, একীভূত বা পুনর্গঠনের আওতায় থাকা ব্যাংকের সাবেক মালিক বা পরিচালকরা নির্দিষ্ট একটি শতাংশ অর্থ পরিশোধ করে আবারও মালিকানা ফিরে পেতে পারেন। এই সুযোগটি অনেকের কাছে উদ্বেগজনক বলে মনে হচ্ছে। কারণ অতীতে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কারণে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তাদেরই আবার মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়ার পেছনে সাধারণত বড় ধরনের ঋণ অনিয়ম, অর্থ পাচার বা অব্যবস্থাপনা দায়ী থাকে। এসব ক্ষেত্রে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় না এনে বরং তাদের জন্য পুনরায় সুযোগ সৃষ্টি করা হলে তা আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এতে ভবিষ্যতে অন্যদের মধ্যেও অনিয়ম করার প্রবণতা বাড়তে পারে।
এছাড়া এই আইনে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একটি ব্যাংকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার আমানতকারীরা। তারা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখেন নিরাপত্তার আশায়। কিন্তু যদি সেই ব্যাংকের মালিকানা আবার এমন ব্যক্তিদের হাতে যায়, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাহলে আমানতকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে। এর ফলে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের প্রবণতা বাড়তে পারে, যা সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতের জন্য ক্ষতিকর।
আইনটি পাস হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও কিছু প্রশ্ন উঠেছে। গণমাধ্যমের তথ্যে জানা যায়, বিতর্কিত ধারাটি সংসদে পাস হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সংযোজন করা হয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কেন শেষ মুহূর্তে করা হলো এবং এতে কারা উপকৃত হতে পারে—এসব বিষয় নিয়ে স্বচ্ছতা না থাকায় সন্দেহ আরও বেড়েছে।
ব্যাংক খাতের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এখন প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা, ঋণ বিতরণে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অতীতে অনিয়মে জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন আইনটি ব্যাংক খাতকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে বাস্তব প্রয়োগে এর ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাবই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এর কার্যকারিতা। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনে আইনে সংশোধন আনার কথাও ভাবা যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর কিছু ধারা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আস্থা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে এই আইন বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রয়োজন। তা না হলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের পরিবর্তে এটি নতুন করে সংকটের জন্ম দিতে পারে, যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মন্তব্য করুন