
হাম বা রুবিওলা (Rubeola) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। ইংরেজিতে এটি সাধারণত মিজলস (Measles) নামে পরিচিত। ভাইরাসের পূর্ণ বৈজ্ঞানিক নাম মিজলস মর্বিলিভাইরাস (Measles morbillivirus)। এটি একটি ক্ষুদ্র আরএনএ ভাইরাস, যার জিনোমে মাত্র ১৫,৮৯৪ নিউক্লিওটাইড এবং ছয়টি প্রধান জিন থাকে। ভাইরাসের দুটি প্রধান সার্ফেস প্রোটিন—হিমাগ্লুটিনিন (H) ও ফিউশন (F)—মানবদেহে প্রবেশ এবং সংক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কোনো সংক্রামক রোগের সংক্রমণ ক্ষমতা বোঝাতে R₀ (আর-নট) নামক ইনডিকেটর ব্যবহৃত হয়। R₀-এর মান নির্দেশ করে যে একজন রোগী গড়ে কতজনকে সংক্রমিত করতে পারে। হামের R₀-এর মান ১২–১৮, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগের মধ্যে রাখে। একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। হামের সংক্রমণ ক্ষমতা প্রায় ৯০ শতাংশ।
হাম ভাইরাস সাধারণত সর্দি-কাশি বা কথা বলার সময় তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র শ্বাসতান্ত্রিক ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসবাহী ড্রপলেট ফুসফুসে প্রবেশ করলে প্রথমে অ্যালভিওলার ম্যাক্রোফেজ এবং সাব-এপিথেলিয়াল ডেনড্রাইটিক কোষে সংক্রমিত হয়। এরপর ভাইরাস নিকটবর্তী লিম্ফ নোডে পৌঁছে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং রক্তে ছড়িয়ে পড়ে, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে সংক্রমণ বিস্তার করে।
রোগী র্যাশ শুরুর ৪ দিন আগে থেকে র্যাশ হওয়ার ৪ দিন পর পর্যন্ত সংক্রমণক্ষম থাকে। সংক্রমণ ছড়ানো রোধের জন্য রোগীকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হামের ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১০–১৪ দিন। প্রাথমিক উপসর্গগুলো হলো:
সবচেয়ে দৃশ্যমান লক্ষণ হলো ত্বকে লাল ফুসকুড়ি (র্যাশ), যা সংক্রমণের ৭–১৮ দিন পরে শুরু হয়। সাধারণত মুখ ও গলার উপরের অংশে দেখা যায় এবং ৩ দিনের মধ্যে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
অধিকাংশ রোগী ৭–১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে এবং শরীরে আজীবন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। হিমাগ্লুটিনিন (H) প্রোটিনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে পুনরায় সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
হামের জটিলতা রোগীর বয়স, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, ভিটামিন-এ-এর অবস্থা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। সাধারণ জটিলতাগুলো হলো:
নিউমোনিয়া সবচেয়ে মারাত্মক জটিলতা এবং মৃত্যুতে প্রভাব ফেলে। সংক্রমণ-পরবর্তী এনসেফালাইটিস প্রতি ১০০০–২০০০ রোগীর মধ্যে ১–৪ জনে দেখা দেয়। সাবঅ্যাকিউট স্ক্লেরোজিং প্যানেন্সফালাইটিস (SSPE) সংক্রমণের কয়েক বছর পরে প্রতি ১০,০০০–১,০০,০০০ রোগীর মধ্যে ১ জনে দেখা দিতে পারে।
বয়স ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে, যেমন HIV আক্রান্ত বা ৫ বছরের কম বয়সী শিশু, হাম গুরুতর হয়। গর্ভবতী মহিলা আক্রান্ত হলে শিশুর জন্ম ওজন কম বা অকাল জন্ম হতে পারে।
উন্নয়নশীল দেশে হামজনিত মৃত্যুহার সাধারণত ৩–৬ শতাংশ। কিছু বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীতে মৃত্যুর হার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এক বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৩০ বছরের বেশি প্রাপ্তবয়স্কদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এইডস আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
উন্নত দেশে মৃত্যুহার প্রায় নেই, সাধারণত ০.০১–০.১ শতাংশ।
শুষ্ক আবহাওয়া ও শীতের শেষ ভাগে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৩ সালের আগে বিশ্বে প্রতি দুই–তিন বছরে মহামারি হত, প্রতি বছর আনুমানিক ২৬ লাখ মৃত্যু হতো। টিকাদানের ফলে ২০০০–২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে হামের রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। এর কারণ:
বাংলাদেশে ২০২৫ সালে প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু হাম ও রুবেলার টিকা পাননি। ফলে ২০২৬ সালে বিভিন্ন স্থানে সংক্রমণ বেড়েছে। এই সময় শিশুদের মধ্যে ৫০-এর বেশি মৃত্যু রিপোর্ট হয়েছে। বিশেষত ছয় মাস বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক।
সরকার জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল থেকে ছয় মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া শুরু করেছে।
হামের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকা। বাংলাদেশে এমআর (MR) টিকা ব্যবহার হয়, যা হাম ও রুবেলার সুরক্ষা দেয়। উচ্চ আয়ের দেশে এমএমআর (MMR) টিকা ব্যবহৃত হয়, যা হাম, রুবেলা ও মাম্পস প্রতিরোধ করে।
টিকা সাধারণত দুই ডোজে দেওয়া হয়:
প্রাপ্তবয়স্করা যারা টিকা পাননি, তারা ২ ডোজ MMR টিকা (কমপক্ষে ২৮ দিন ব্যবধানে) নিতে পারেন। বাংলাদেশে Rubavex-M ভ্যাকসিনের দাম এক ডোজ ৪০০ টাকা।
হাম শুধুমাত্র শিশুদের রোগ নয়। প্রাপ্তবয়স্কদের সংক্রমণও সাধারণ। বিশেষত যারা টিকা পাননি বা অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস ও অন্যান্য জটিলতা বেশি।
সরকার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেশের হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে হাম দেশব্যাপী ছড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিটি শিশুকে টিকা নিশ্চিত করা, টিকা বিতরণ ও প্রাপ্যতা অটুট রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন