
রাজধানীর সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে চিকিৎসাসেবা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়েছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় পুরো হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন জরুরি চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।
ঘটনার পরপরই জরুরি বিভাগের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভেতরে চিকিৎসকরা অবস্থান নেন এবং বাইরে অবস্থান নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ফলে নতুন কোনো রোগীকে জরুরি বিভাগে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি অভিযোগ রয়েছে, ভেতরে থাকা কিছু রোগীকেও জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সময় জরুরি বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায়, গেট তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ভেতরে চিকিৎসকরা অবস্থান করছেন এবং বাইরে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। এ অবস্থায় জরুরি চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরে ঢুকতে পারছেন না।
জেসমিন আক্তার নামে এক রোগী জানান, “আমি কয়েকদিন ধরে অসুস্থ। আজ চিকিৎসা নিতে এসে টিকিটও কেটেছি। কিন্তু হঠাৎ করে বিশৃঙ্খলা শুরু হলে আমাকে ভেতর থেকে বের করে দেওয়া হয়। এখন আমি কী করব বুঝতে পারছি না।”
আরেকজন রোগীর স্বজন বলেন, “আমার ভাই অপারেশন থিয়েটারে আছে। আমি ভেতরে যেতে চাই, কিন্তু আমাকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এই অবস্থায় আমরা খুব অসহায় হয়ে পড়েছি।”
ঘটনার শুরু হয় এক অসুস্থ শিক্ষার্থীকে ঘিরে। জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে এলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করে কিছু ওষুধ দেন এবং একটি ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনে আনার পরামর্শ দেন। ওই ইনজেকশনটি হাসপাতালে ছিল না।
শিক্ষার্থীর সঙ্গে থাকা সহপাঠীরা বাইরে গিয়ে ইনজেকশনটি খুঁজে না পেয়ে আবার হাসপাতালে ফিরে আসেন। তারা চিকিৎসকের কাছে ওষুধ পরিবর্তনের অনুরোধ করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয় এবং তা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ ইমন অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের এক ছোট ভাই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসে। ডাক্তার যে ওষুধ দেন, তা আমরা কোথাও পাইনি। পরে আবার ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং এক পর্যায়ে আমাদের ওপর হামলা করা হয়।”
জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, যে ইনজেকশনটি দেওয়া হয়েছিল তা সাধারণত বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়। তবে কোনো কারণে তা না পাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, “আমাদের সহকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা জরুরি বিভাগের গেট বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা চালু রাখা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু শিক্ষার্থী জোর করে গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
ঘটনার পর হাসপাতাল এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, বিকেলের দিকে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং এরপর থেকে জরুরি বিভাগে নতুন রোগী নেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, “পরিস্থিতি এখনও উত্তপ্ত। আমরা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি।”
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে কাজ করছে।
ঘটনার পর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রধান প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপাশে চিকিৎসকরা এবং অন্যপাশে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বড় সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বন্ধ হয়ে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে শুধু ওই মুহূর্তের রোগীরাই নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জরুরি বিভাগ এমন একটি স্থান, যেখানে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সেখানে সেবা বন্ধ থাকলে তা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত সমাধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী—উভয় পক্ষকেই সংযত আচরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালে ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, রোগীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
উপসংহার
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এই অচলাবস্থা শুধু একটি সংঘর্ষের ঘটনা নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার একটি প্রতিচ্ছবি। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা না গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।
মন্তব্য করুন