
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পর কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সব সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে তারা একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে তাদের অবস্থান, উদ্বেগ এবং সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে জাতীয় সংসদে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের মধ্য দিয়ে। গত বৃহস্পতিবার সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। এই বিলের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করা হয় এবং ২০০৯ সালে প্রণীত আগের আইন পুনরায় কার্যকর করা হয়। বিলটি পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার কমিশনের বর্তমান কাঠামো কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। কমিশনের সচিব কুদরত-এ-ইলাহী গণমাধ্যমকে জানান, অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় কমিশনের বর্তমান কাঠামো আর কার্যকর নেই। ফলে সদস্যদের দায়িত্বে থাকার সুযোগও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে গেছে। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বিদায়ী সদস্য নাবিলা ইদ্রিসও। তিনি বলেন, যে আইনি ভিত্তির ওপর তারা দায়িত্ব পালন করছিলেন, সেটি বাতিল হওয়ায় তাদের পদে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
এরপরই চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ কমিশনের অন্যান্য সদস্যরা সম্মিলিতভাবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম এবং নাবিলা ইদ্রিস। পদত্যাগের পাশাপাশি তারা একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন, যেখানে তারা সরকারের সিদ্ধান্ত এবং এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।
খোলা চিঠিতে বিদায়ী সদস্যরা উল্লেখ করেন, অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। তারা বলেন, অনেক ভুক্তভোগী ইতোমধ্যে তাদের কাছে প্রশ্ন করছেন—এই পরিস্থিতিতে তাদের করণীয় কী। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই তারা এই খোলা চিঠি লিখতে বাধ্য হয়েছেন।
চিঠির শুরুতেই তারা স্পষ্ট করে দেন, এটি কোনো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়। বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষদের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তারা এই অবস্থান তুলে ধরছেন। তাদের ভাষায়, ভুক্তভোগীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই উদ্যোগ।
চিঠিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। প্রথমত, সংসদে অধ্যাদেশ নিয়ে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তা নিয়ে তারা নিজেদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, কিছু তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি, যা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সরকার যে কারণে অধ্যাদেশ বাতিল করেছে বলে জানিয়েছে, সেই কারণগুলোর যৌক্তিকতা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, অধ্যাদেশের কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি থাকলেও সেটি পুরোপুরি বাতিল না করে সংশোধনের মাধ্যমে উন্নত করা যেত।
তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে মানবাধিকার সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করা উচিত, সে বিষয়ে কিছু প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গড়ে তুলতে হলে আইনের গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, হঠাৎ করে অধ্যাদেশ বাতিল এবং কমিশনের সদস্যদের পদত্যাগ মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি শূন্যতা তৈরি করতে পারে। আবার অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, পুরোনো আইন পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে একটি নতুন কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবাধিকার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আইনগত পরিবর্তনের ফলে যদি কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন করে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো গড়ে তোলার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে একটি আরও শক্তিশালী ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ঘিরে এই পরিবর্তন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে কীভাবে একটি কার্যকর, স্বাধীন ও জনগণের আস্থা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। ভুক্তভোগীদের স্বার্থ রক্ষা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত ও সুসংগঠিত পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন