
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একটি মানবিক ও সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা শহর ও গ্রাম—উভয় পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবাকে সম্প্রসারণ এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে জোরদার করার ওপর কেন্দ্রিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী এই বার্তাটি প্রদান করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মতো একটি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্যসেবার মান ও নাগরিক সেবার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’ (Together for Health, Stand with Science)। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দিবস শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সম্মান জানার উপলক্ষ নয়, বরং এটি নাগরিকদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমও।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তিনি ‘ওয়ান হেলথ’ (One Health) ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা মানুষ, পশুপাখি ও পরিবেশ—এই তিনটির সুস্থতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনসংখ্যার সুস্থতার মধ্যে সমন্বয় আনাই সরকারের বর্তমান নীতির মূল লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানের অগ্রগতি স্বাস্থ্যসেবার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই, মানসম্পন্ন এবং বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী উদাহরণ হিসেবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং (ML)-এর ব্যবহার উল্লেখ করেন, যা চিকিৎসা শিক্ষা, রোগ নির্ণয় ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসারে বিপুল ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’—এই নীতিকে অঙ্গীকার করেছে। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব এবং এই নীতি অনুযায়ী সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করছে। তিনি বলেন, প্রতিটি নাগরিক যেন সহজলভ্য ও সমান সুযোগে চিকিৎসা সেবা পায়—এটি সরকারের লক্ষ্য।
সরকার ইতোমধ্যেই দেশব্যাপী ধাপে ধাপে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবে। প্রধানমন্ত্রী জানান, এই উদ্যোগ স্বাস্থ্যসেবার প্রসার এবং নারীর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড চালু করা হবে, যা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল এবং প্রযুক্তিভিত্তিক করবে।
দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের চিকিৎসা কার্যক্রমে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যবিমা চালু এবং ধাপে ধাপে বিস্তার, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার—all এই বিষয়গুলো সরকারের পরিকল্পনার অংশ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে, যাতে দেশের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোকে শক্তিশালী করা সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন ও জনগণের জন্য সহজলভ্য করে তোলা সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কাজ। সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠন করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে দিনটি ঘিরে আয়োজিত সকল কার্যক্রমের সফলতা কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, আধুনিক প্রযুক্তি, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রণ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মানকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। তিনি বলেন, প্রতিটি চিকিৎসা কেন্দ্র, হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা, রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ সরকারের অঙ্গীকার।
শিশু ও মা’র স্বাস্থ্য, দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিমা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, নারীর স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে নিয়োগ—এই সবকিছু মিলিয়ে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা দেশের মানুষের জন্য নতুন আশার আলো হয়ে উঠবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের এই উদ্যোগ শুধু স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে নয়, দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের বার্তায় তিনি বলেন, “মানবিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা একটি স্বাস্থ্যকর, সমন্বিত এবং প্রতিরোধক্ষম সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে।”
প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা দেশের স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি সংযোজন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন