
দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত এবং উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এতে করে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১৬৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই পরিসংখ্যান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে, কারণ অল্প সময়ের মধ্যে এত সংখ্যক শিশুমৃত্যু দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি হামের উপসর্গ নিয়ে সন্দেহজনক অবস্থায় মারা গেছে আরও ১৪৫ শিশু। সব মিলিয়ে এই সময়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৯ জনে।
শুধু মৃত্যুই নয়, আক্রান্তের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে দেশে মোট ১৮ হাজার ৮৭৪ শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৮৯ জনের ক্ষেত্রে রোগটি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে, আর বাকি ১৪ হাজার ৩৮৫ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এই বিপুল সংখ্যক আক্রান্ত শিশু দেশের স্বাস্থ্যখাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগে মোট ৭ হাজার ৪৭৮ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, যা দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় অনেক বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৪৯। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ন এবং টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এই দুই বিভাগে সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যথাসময়ে টিকা না নেওয়া, অপুষ্টি এবং জনসচেতনতার অভাব এই রোগের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদান কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, হামের লক্ষণ হিসেবে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি জটিল আকার ধারণ করলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কের সংক্রমণও হতে পারে, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং চিকিৎসকদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা যায়।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অসুস্থ শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া—এসব বিষয় অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে স্কুল, মাদ্রাসা এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
এছাড়া গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্য প্রচার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে হামের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা গেলে সংক্রমণ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সংক্রমণের বিস্তার রোধ করা এবং মৃত্যুহার কমিয়ে আনা। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, দেশে হামের এই পরিস্থিতি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকেত। অল্প সময়ের মধ্যে এত সংখ্যক শিশুর মৃত্যু ও আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, অন্যথায় এটি বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
মন্তব্য করুন