
সংসদ এলাকায় ‘জঙ্গি এমপি’ বলে অপবাদ দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে বিশেষ অধিকারের নোটিশ দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের সংসদ সদস্য সাইদউদ্দিন আহমদ হানজালা। বিষয়টি সংসদে উত্থাপিত হওয়ার পর তা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ, সংসদ চত্বরে তাকে প্রকাশ্যে এমনভাবে সম্বোধন করা হয়েছে, যা তার ব্যক্তিগত সম্মান ও সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্য মর্যাদার পরিপন্থী।
বৃহস্পতিবার সংসদের অধিবেশন শুরু হলে প্রশ্নোত্তর পর্বের টেবিলে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে বিশেষ অধিকারের নোটিশ উপস্থাপন করেন। স্পিকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে তা সংসদের বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দেন, যাতে বিস্তারিত তদন্ত ও পর্যালোচনার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা যায়।
এর আগে একই বিষয় পয়েন্ট অব অর্ডারে উত্থাপন করলে স্পিকার তাকে নিয়ম অনুযায়ী বিশেষ অধিকারের নোটিশ দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শ অনুসারেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিশ জমা দেন। সংসদীয় বিধি অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যদি মনে করেন তার মর্যাদা বা অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, তাহলে তিনি এ ধরনের নোটিশ দিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হয়।
নোটিশ উপস্থাপনকালে সাইদউদ্দিন আহমদ হানজালা জানান, গত মাসের ৩০ তারিখে সংসদ এলাকায় তাকে উদ্দেশ করে ‘জঙ্গি এমপি’ বলে অপবাদ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত অপমান নয়, বরং একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মর্যাদার ওপর আঘাত।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের শব্দচয়ন একটি নেতিবাচক সংস্কৃতির অংশ, যা দীর্ঘদিন ধরে সমাজে প্রচলিত রয়েছে। তার মতে, ‘জঙ্গি’ শব্দটি ব্যবহার করে অনেক সময় নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে লক্ষ্য করে অপপ্রচার চালানো হয়। এতে সমাজে বিভাজন তৈরি হয় এবং অনেক নিরীহ মানুষ অযথা হেয় প্রতিপন্ন হন। তিনি এই শব্দকে ‘ফ্যাসিস্ট ধাঁচের’ বলেও উল্লেখ করেন।
সংসদ সদস্য হিসেবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসা একজন প্রতিনিধির প্রতি এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শুধু একজন ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটে না, বরং পুরো সংসদীয় ব্যবস্থার মর্যাদাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তিনি মনে করেন, এ ধরনের ঘটনার যথাযথ প্রতিকার না হলে ভবিষ্যতে অন্য সদস্যদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ সময় তিনি স্পিকারের কাছে অনুরোধ জানান, যেন সংসদের সব সদস্যের সম্মান রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, সংসদ এমন একটি জায়গা, যেখানে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কোনোভাবেই যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের সুযোগ না থাকে—সেই বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্পিকার তার বক্তব্যে বলেন, বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হয়েছে এবং সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী তা বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। এই কমিটি বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন দেবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংসদ সদস্যদের সম্মান ও অধিকার রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ ধরনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
সংসদীয় বিশেষ অধিকারের বিষয়টি মূলত সংসদ সদস্যদের কাজের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত। কোনো সদস্য যদি মনে করেন তার ওপর অন্যায় আচরণ হয়েছে বা তার কাজের পরিবেশ ব্যাহত হয়েছে, তাহলে তিনি এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা প্রতিনিধিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়, যা বিভ্রান্তি বা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। তাই এই বিষয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবশেষে বলা যায়, এই নোটিশ শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়; বরং এটি সংসদীয় আচরণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক সম্মানের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত শেষে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ
মন্তব্য করুন