
জুলাই বিপ্লবী ও আধিপত্যবাদবিরোধী ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার দুই আসামিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ভারত সরকার সম্মত হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বুধবার (৮ এপ্রিল) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী শ্রী হরদীপ পুরী উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা উভয়পক্ষের স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন। এছাড়া শহীদ ওসমান হাদির হত্যা মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের পর তাদের বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ বিষয়ে প্রক্রিয়া এবং তার সময়সূচি নির্ধারণেও আলোচনা হয়েছে।
ড. খলিলুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সদ্য নির্বাচিত বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। এই নীতিতে দেশের স্বার্থ, পারস্পরিক আস্থা এবং দুই দেশের সুবিধার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে ভারত সরকারের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে এবং গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।
বৈঠকের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর উল্লেখ করেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়া, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা আরও সহজ করা হবে। এটি দুই দেশের নাগরিকদের জন্য সুবিধাজনক হবে এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে ডিজেল সরবরাহ এবং সার সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও অনুরোধ করা হয়। মন্ত্রী হরদীপ পুরী জানান, ভারত সরকার এই অনুরোধকে ইতিবাচক ও অনুকূলভাবে বিবেচনা করবে।
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বিষয়ও আলোচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের বিষয়েও বাংলাদেশি পক্ষ ভারত সরকারের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে। বৈঠকে উভয়পক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার বিষয়ে ঐক্যমত প্রকাশ করে।
ড. খলিলুর রহমান মঙ্গলবার দিল্লিতে পৌঁছানোর পর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে উভয়পক্ষ কৌশলগত, নিরাপত্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক বিষয়গুলিতে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। এছাড়া দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের পর ভারতের সমর্থন পাওয়ায় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাজ সহজ হবে এবং হত্যার বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে এবং আইনি প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হবে।
এছাড়া বৈঠকে ভারতীয় ভিসা ব্যবস্থার সহজীকরণ, চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসার সুবিধা, ডিজেল ও সার সরবরাহ বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয় এবং উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বুধবার বৈঠক শেষে জানান, তিনি আগামী ৯ এপ্রিল দিল্লি থেকে মরিশাসের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করবেন। তিন দিনের সফরে এই বৈঠকগুলো দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈঠকের মাধ্যমে শুধু হাদি হত্যা মামলার আসামিদের প্রত্যর্পণ নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং কৌশলগত সমঝোতার ক্ষেত্রেও নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হবে।
এই সফর এবং বৈঠকগুলোর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে আইন প্রয়োগ, নিরাপত্তা, বিচার প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সুফল আশা করা যাচ্ছে। ভারত সরকারের সহযোগিতা বাংলাদেশে বিচার প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে।
মন্তব্য করুন