
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালুর উদ্যোগ নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর এই গুরুত্বপূর্ণ জনশক্তি বাজার পুনরায় খোলার সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে প্রবাসী আয় ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই আশার পাশাপাশি পুরোনো এক শঙ্কাও আবার সামনে চলে এসেছে—রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সিন্ডিকেট এবং অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কা।
দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অন্যতম প্রধান গন্তব্য ছিল। হাজার হাজার কর্মী সেখানে গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন এবং দেশে পাঠিয়েছেন বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় এবং সীমিত সংখ্যক এজেন্সির একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে এই বাজারটি বিতর্কিত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় শ্রমবাজারটি। এর ফলে বহু সম্ভাবনাময় কর্মী বিদেশ যাওয়ার সুযোগ হারান এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রুত সময়ের মধ্যে এই শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়। বৈঠকে অভিবাসন ব্যয় কমানো, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে।
তবে এই ‘বিশ্বাসযোগ্য’ শব্দটিই আবার নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এর আড়ালে আবারও সীমিত সংখ্যক এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে, যা অতীতে সিন্ডিকেট গঠনের পথ তৈরি করেছিল। যদি একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তাহলে পুরোনো সমস্যাগুলো আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, এবার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা হবে। মালয়েশিয়া একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো—স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দালালচক্র কমানো এবং কর্মীদের ওপর আর্থিক চাপ হ্রাস করা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী, ‘নিয়োগকর্তাই খরচ বহন করবে’—এই নীতিকে সামনে রেখে অভিবাসন ব্যয় শূন্যে নামিয়ে আনার কথাও বলা হচ্ছে।
কাগজে-কলমে এই পরিকল্পনা অত্যন্ত ইতিবাচক মনে হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অতীতেও ‘শূন্য খরচে কর্মী পাঠানো’ এবং ‘স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা’ নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে এবং অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ফলে নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূল জায়গা হলো নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা। যদি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যথাযথ নজরদারি না থাকে, তাহলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাও দুর্নীতিমুক্ত রাখা কঠিন হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার উভয় দেশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও এজেন্সির যোগসাজশ অতীতে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা গেছে। এই জায়গায় কঠোর ব্যবস্থা না নিলে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ। অনেকেই মনে করছেন, সব এজেন্সিকে সমান সুযোগ দেওয়া হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দুর্নীতি কমবে। কিন্তু যদি শুরু থেকেই কিছু নির্দিষ্ট এজেন্সিকে বেছে নেওয়া হয়, তাহলে অন্যরা তাদের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ পাবে না। এতে বাজার আবারও একটি সীমিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
অন্যদিকে, সরকার বলছে তারা পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত রাখতে বদ্ধপরিকর। নিয়মিত তদারকি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এবার ভিন্নধর্মী একটি নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের কথাও বলা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ঘোষণা দিলেই হবে না—বাস্তবায়নই এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে বিভিন্ন চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর অনেক শর্তই ঠিকভাবে পালন করা হয়নি। তাই নতুন করে চুক্তি করার আগে আগের চুক্তিগুলোর দুর্বলতা বিশ্লেষণ করা জরুরি ছিল। কোন জায়গায় ঘাটতি ছিল, কোথায় ব্যর্থতা হয়েছে—এসব মূল্যায়ন করে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করলে ফলাফল আরও ভালো হতে পারত।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় পরিসংখ্যান থেকে। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। শুধু ২০২৩ সালেই তিন লাখের বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন, যা একটি রেকর্ড। এই বিপুল সংখ্যক কর্মী দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
কিন্তু একই সঙ্গে এই খাতটি নানা অনিয়ম ও শোষণের শিকার হয়েছে। অনেক কর্মী অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে বিদেশে গেছেন, কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ বা বেতন পাননি। কেউ কেউ আবার অবৈধভাবে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন। এসব সমস্যার মূল কারণ ছিল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই নতুন উদ্যোগ কি সত্যিই পরিবর্তন আনতে পারবে, নাকি আগের মতোই পরিস্থিতি থেকে যাবে? অনেকেই আশাবাদী যে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক নজরদারি থাকলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। আবার অনেকে মনে করছেন, যদি মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান না করা হয়, তাহলে নতুন ব্যবস্থাও পুরোনো সমস্যার বাইরে যেতে পারবে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একদিকে বড় সুযোগ, অন্যদিকে বড় চ্যালেঞ্জ। এটি যেমন হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিতে পারে, তেমনি সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে আবারও দুর্নীতি ও শোষণের শিকার হতে পারে শ্রমিকরা।
এই বাস্তবতায় সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো—স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সব এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা, কঠোর নজরদারি বজায় রাখা এবং শ্রমিকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এটি সফল করতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, এই আশার আলো খুব দ্রুতই আবার অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারে।
মন্তব্য করুন