
গত ৭ এপ্রিল বগুড়ায় অনুষ্ঠিত হলো চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, যা বাংলাদেশে সঙ্গীতশিল্পীদের অবদানকে স্বীকৃতি জানানোর ক্ষেত্রে অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন হিসেবে বিবেচিত। এবারের আয়োজনের সবচেয়ে বিশেষ মুহূর্তটি ছিল দেশের প্রখ্যাত এবং জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী কনকচাঁপাকে ‘আজীবন সম্মাননা’ দিয়ে ভূষিত করা। ৪২ বছর ধরে বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে নিজের গান এবং সৃজনশীল অবদানের মাধ্যমে শ্রোতাদের মন জয় করা কনকচাঁপার জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য এবং গৌরবময় মুহূর্ত।
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ও অতিথিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানে কনকচাঁপাকে উত্তরীয়, সম্মাননা প্রদান এবং একটি চেক তুলে দেন তথ্যমন্ত্রী জহিরউদ্দীন স্বপন, চ্যানেল আই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর সহ আরও অনেকে।
কনকচাঁপা এই সম্মাননা প্রাপ্তি প্রসঙ্গে বলেন, “আমি সিরাজগঞ্জের কাজীপাড়ার মেয়ে। আমার শ্বশুরবাড়ি বগুড়ায়, তাই বগুড়ার মাটিতে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে আজীবন সম্মাননা পেয়ে খুবই আনন্দিত। নিঃসন্দেহে এটি আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। তবে এই বয়সে সম্মাননা পাওয়ায় আমার মধ্যেও মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। নিজেকেই প্রশ্ন করছি, ‘এই বয়সে কি জাতিকে কিছু দিতে পারলাম?’ তবে অন্য দিকে ইতিবাচকভাবেও মনে হচ্ছে, ৪২ বছরের পেশাগত সঙ্গীত জীবনের অবদান স্বীকৃত হলো, যা আনন্দের।”
কেবল কনকচাঁপাই নয়, এবার বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন আরও একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া। তাদের অবদানের স্বীকৃতিই চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এর অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ ছিল।
এছাড়া এই অনুষ্ঠানে মোট ৮টি ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড বিতরণ করা হয়। আধুনিক গানের শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে লিজা (গান: ‘খুব প্রিয় আমার’) কে নির্বাচিত করা হয়। ইউটিউবে কমপক্ষে একলক্ষবার ভিউ এবং ১৫০০ লাইক পাওয়া আধুনিক গানে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন এঞ্জেল নূর (গান: ‘যদি আবার’)। আধুনিক গানের শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে স্বীকৃতি পান বাপ্পা মজুমদার (গান: ‘অবশেষে’), এবং শ্রেষ্ঠ গীতিকার নির্বাচিত হন তারেক আনন্দ ও শাহনাজ কাজী (গান: ‘প্রেমবতী মা’)।
শ্রেষ্ঠ ব্যান্ড হিসেবে সম্মানিত হয় মেট্রিক্যাল (গান: ‘গণতন্ত্রের ঘুড়ি’)। শ্রেষ্ঠ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সেতু চৌধুরী এবং শ্রেষ্ঠ দ্বৈত সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে ইমরান ও সিঁথি সাহা এই সম্মান অর্জন করেন। লোকসঙ্গীতের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে নির্বাচিত হন বিউটি (গান: ‘চার চাঁদে দিচ্ছে ঝলক’) এবং ইউটিউবে সফল লোকসঙ্গীত হিসেবে অ্যাওয়ার্ড পান শরিফ উদ্দিন দেওয়ান সাগর (গান: ‘মা লো মা’)।
ছায়াছবির গান বিভাগে শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে সম্মাননা পান আতিয়া আনিসা (গান: ‘ছোট্ট সোনা’) এবং ইউটিউবে সাফল্য পাওয়া ছায়াছবির গান হিসেবে অ্যাওয়ার্ড পান দিলশাদ নাহার কণা (গান: ‘দুষ্টু কোকিল’)। শ্রেষ্ঠ সুরকার ছায়াছবির ক্ষেত্রে নির্বাচিত হন শওকত আলী ইমন (গান: ‘ছোট্ট সোনা’), আর শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে স্বীকৃতি পান রোহিত সাধুখাঁ (গান: ‘বেঁচে যাওয়া ভালোবাসা’)।
অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ মিউজিক ভিডিও নির্মাতা হিসেবে নির্বাচিত হন তানভীর তারেক (ভিডিও: ‘পাখি আমার নীড়ের পাখি’), শ্রেষ্ঠ নজরুল সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে শহিদ কবির পলাশ (গান: ‘সৃজন ছন্দে’), শ্রেষ্ঠ উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে নাশিদ কামাল (গান: ‘সব সখিয়া চলো’), এবং শ্রেষ্ঠ নবাগত শিল্পী হিসেবে সভ্যতা (গান: ‘অধিকার’) সম্মানিত হন। এছাড়া শ্রেষ্ঠ অডিও কোম্পানি হিসেবে নির্বাচিত হয় বেঙ্গল মিউজিক।
চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড প্রতি বছরই বাংলাদেশের সঙ্গীতশিল্পীদের প্রেরণা যোগায় এবং তাদের সৃজনশীলতা উদযাপন করে। এই আয়োজনের মাধ্যমে দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে অবদান রাখার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কনকচাঁপা এবং অন্যান্য অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্তরা প্রতিটি শ্রোতার কাছে বাংলাদেশের সঙ্গীতের গৌরবকে আরও দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেছেন।
চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এর আয়োজন কেবল পুরস্কার বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি শিল্পীদের মধ্যে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধিরও একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে। কনকচাঁপা যেমন দেশের সঙ্গীতাঙ্গনের অন্যতম মাইলফলক, তেমনি এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা তাদের সম্ভাবনা এবং দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছেন।
সার্বিকভাবে বলা যায়, চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এর আয়োজন বাংলাদেশের সঙ্গীতের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে। কনকচাঁপার আজীবন সম্মাননা এবং অন্যান্য শিল্পীদের প্রাপ্ত স্বীকৃতি এই শিল্পক্ষেত্রে উদ্ভাবন ও স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। অনুষ্ঠানটি প্রমাণ করল, বাংলাদেশের সঙ্গীত সংস্কৃতি এখনও প্রাণবন্ত, এবং তরুণ ও প্রবীণ শিল্পীরা একসাথে দেশের সঙ্গীতের সমৃদ্ধিতে অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মন্তব্য করুন