
রাঙামাটিতে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাই উৎসব ঘিরে জলকেলির উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার অংশ হিসেবে প্রতিবছরের মতো এবারও আয়োজিত হয় ‘মৈত্রীময় পানি বর্ষণ উৎসব’, যেখানে অংশ নিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানান হাজারো মানুষ। পুরোনো বছরের দুঃখ, কষ্ট, গ্লানি ধুয়ে ফেলে নতুন আশায়, নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করার প্রতীক হিসেবেই এই জলকেলি উৎসবের আয়োজন করা হয়।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) রাঙামাটির মারী স্টেডিয়ামে দিনব্যাপী এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই উৎসবস্থলে জড়ো হতে থাকেন মারমা সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। রঙিন পোশাকে সজ্জিত অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। একে অপরকে পানি ছিটিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়ে তারা নতুন বছরের শুভসূচনা করেন।
সাংগ্রাই উৎসব মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো জলকেলি বা পানি বর্ষণ। বিশ্বাস করা হয়, পানি ছিটানোর মাধ্যমে মানুষের জীবনের সকল অশুভ শক্তি দূর হয় এবং নতুন বছর আসে পবিত্রতা ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে। তাই উৎসবে অংশগ্রহণকারীরা হাসি-আনন্দে ভেসে একে অপরকে পানি ছিটিয়ে নিজেদের পরিশুদ্ধ করার প্রতীকী রীতি পালন করেন।
এই জলকেলি উৎসবকে ঘিরে রয়েছে আরও একটি সামাজিক দিক। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এই উৎসবের সময় মারমা তরুণ-তরুণীরা নিজেদের পছন্দের মানুষকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়। অনেক সময় এই উৎসবেই গড়ে ওঠে নতুন সম্পর্ক, বিনিময় হয় ভালোবাসা ও অনুভূতির প্রকাশ। ফলে এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এরপর আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা, যেখানে অতিথিরা সাংগ্রাই উৎসবের তাৎপর্য ও পার্বত্য অঞ্চলের সংস্কৃতি সংরক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য দেন। পরে শুরু হয় মৈত্রীময় পানি বর্ষণ, যা ছিল পুরো আয়োজনের মূল আকর্ষণ। এ সময় তরুণ-তরুণীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে পুরো স্টেডিয়াম মুখর হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, এই ধরনের উৎসব পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণ ও লালন করে আসছে, যা দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি আরও বলেন, এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল এবং রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক। তারা উৎসবের প্রশংসা করে বলেন, এই আয়োজন পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, গান ও বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা ছিল দর্শকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। এতে করে উপস্থিত দর্শনার্থীরা শুধু জলকেলির আনন্দই নয়, বরং মারমা সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত পাহাড়ি ও বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে এই উৎসব উপভোগ করেন, যা পারস্পরিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে।
এই আয়োজনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল জোরদার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনও সার্বক্ষণিক তদারকিতে ছিল, যাতে উৎসবটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই আনন্দঘন পরিবেশে দিনটি শেষ হয়।
সাংগ্রাই উৎসবের এই জলকেলি শুধু একটি আনন্দ আয়োজন নয়; এটি একটি বার্তা বহন করে—পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনকে বরণ করার বার্তা। সমাজে সম্প্রীতি, ভালোবাসা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এই উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এবারের এই উৎসবের মধ্য দিয়েই রাঙামাটিতে নববর্ষ উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। তবে অংশগ্রহণকারীদের মনে রয়ে গেছে এক ঝলমলে স্মৃতি, যা তাদের আগামী দিনগুলোতেও অনুপ্রেরণা জোগাবে। নতুন বছরের এই সূচনায় সবার প্রত্যাশা—আগামীর দিনগুলো হোক শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুখের বার্তায় ভরপুর।
মন্তব্য করুন