
রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে এখন এক হৃদয়বিদারক চিত্র—ক্যানুলা, অক্সিজেন পাইপ আর নলের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে হাজার হাজার শিশু। হাম, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগে আক্রান্ত এসব শিশুদের জীবন যেন ঝুলে আছে এক অনিশ্চিত সূতায়। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে অসংখ্য অসহায় বাবা-মায়ের উদ্বেগ, কান্না আর দুশ্চিন্তার ছাপ।
মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা অটোচালক আবু সাইদের সাত মাস বয়সী একমাত্র সন্তান ইউসুবের গল্প যেন এই সংকটের প্রতিচ্ছবি। নিউমোনিয়া নিয়ে প্রায় ২৪ দিন আগে তাকে রাজধানীর একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রথমদিকে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও হঠাৎ করেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। হাসপাতালেই সে হামে আক্রান্ত হয়, আর সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন লড়াই।
ইউসুবের শরীর এখন নিস্তেজ। মাথায় ক্যানুলা, এক নাকে অক্সিজেনের পাইপ, অন্য নাক দিয়ে নলের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে খাবার। শরীরজুড়ে লাল র্যাশ, শ্বাস নিতে কষ্ট—সব মিলিয়ে তার অবস্থা সংকটাপন্ন। ছেলের শিয়রে বসে মা মৌসুমি অঝোরে কাঁদছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ইউসুবের জরুরি আইসিইউ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আইসিইউ বেডের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। বাবা আবু সাইদ দৌড়ঝাঁপ করেও জানতে পারেন, অন্তত দুই থেকে তিন দিনেও আইসিইউ পাওয়া সম্ভব নয়। এই অপেক্ষাই যেন সবচেয়ে ভয়াবহ।
এমন গল্প শুধু ইউসুবের নয়, হাসপাতালের প্রতিটি কোণায় একই ধরনের অসংখ্য গল্প ছড়িয়ে আছে। আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জাকির হোসেনের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে গভীর শোক। কয়েকদিন আগেই হামে আক্রান্ত হয়ে তার যমজ কন্যার একজন মারা গেছে। অন্য সন্তান এখনও আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। কথা বলতে গিয়েই ভেঙে পড়েন তিনি। তার কণ্ঠে অসহায়তার ছাপ—একদিকে সন্তান হারানোর বেদনা, অন্যদিকে আরেক সন্তানের জীবন নিয়ে শঙ্কা।
ওয়ার্ডের ভেতরে আরও ভয়াবহ দৃশ্য। মাত্র দুই মাস বয়সী আয়মানের হাতেও ক্যানুলা, নাকে অক্সিজেনের নল। তার মা জান্নাত আরা বেগম তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। মুখে ঘা থাকায় শিশুটি কিছু খেতে পারছে না। ক্ষুধা আর শ্বাসকষ্ট মিলিয়ে তার কান্না যেন পুরো ওয়ার্ডকে ভারী করে তোলে। এমন অসহায় দৃশ্য প্রতিদিনই দেখছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
শুধু একটি হাসপাতাল নয়, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও একই চিত্র। সেখানে রোগীর চাপ এত বেশি যে নির্ধারিত বেডের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি শিশু ভর্তি হচ্ছে। যে ওয়ার্ডে মাত্র কয়েকটি বেড থাকার কথা, সেটিই এখন পূর্ণ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এক বেডে একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা সাত মাস বয়সী জান্নাতির অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। তার হাতে ক্যানুলা থাকার কারণে হাত ফুলে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় বাবা-মা মিলে অক্সিজেন মাস্ক ধরে রেখেছেন। কিন্তু তাতেও শিশুটির কান্না থামছে না। এই দৃশ্য যেন পুরো সংকটের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে।
চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক শিশুর ক্ষেত্রে মুখে খাবার দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। কারণ শ্বাসকষ্টের কারণে খাবার শ্বাসনালীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বাধ্য হয়ে নাক দিয়ে নল প্রবেশ করিয়ে খাবার দেওয়া হচ্ছে। এটি শিশুদের জন্য কষ্টদায়ক হলেও জীবন বাঁচানোর জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
হাসপাতালগুলোর সার্বিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। একটি ৬০ শয্যার ওয়ার্ডে প্রতিদিন ৭০-৮০ জন পর্যন্ত শিশু ভর্তি থাকছে। আইসিইউ বেডের সংখ্যা সীমিত, কিন্তু গুরুতর রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে যাদের জরুরি আইসিইউ প্রয়োজন, তাদের অনেকেই অপেক্ষায় থাকছে—যা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে হাম ও এর উপসর্গে দেশে শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরপর রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের প্রকোপ হঠাৎ করে এতটা বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে টিকাদানের ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া অন্যতম। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ের আগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এ অবস্থায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। আগে যেখানে ৯ মাস বয়সে টিকা দেওয়া হতো, এখন তা কমিয়ে ৬ মাসে নিয়ে আসা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং আগামী দিনে তা আরও বিস্তৃত করা হবে। লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে কয়েক কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা।
তবে শুধু টিকাদানই নয়, হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, আইসিইউ বেড বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এখনো নেই।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, দেশের হাসপাতালগুলোতে এখন এক নীরব যুদ্ধ চলছে—যেখানে ছোট ছোট শিশুরা লড়ছে জীবনের জন্য। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে অসহায় বাবা-মা, আর চিকিৎসকরা চেষ্টা করছেন সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দিতে। এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ। নইলে ক্যানুলা আর নলের সঙ্গে এই জীবনযুদ্ধ আরও দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক হয়ে উঠবে।
মন্তব্য করুন