
লেবানন সীমান্তজুড়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে সংঘাতের মাত্রা বেড়েছে। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘর্ষে একের পর এক সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইসরাইলি বাহিনীকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। সর্বশেষ অভিযানে তারা দখলকৃত উত্তর ফিলিস্তিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্রুজ মিসাইল হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাসকাভ-আম নামে পরিচিত ওই ঘাঁটিতে চালানো এই হামলাটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী আঘাত। বিশ্লেষকদের মতে, ক্রুজ মিসাইল ব্যবহারের মাধ্যমে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক সক্ষমতার একটি নতুন দিক তুলে ধরেছে। কারণ এই ধরনের মিসাইল সাধারণত অত্যন্ত নির্ভুল লক্ষ্যভেদে সক্ষম এবং উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও ফাঁকি দিতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু এই হামলাই নয়, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্তত ৩০টির বেশি অভিযান পরিচালনার দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরাইলি সামরিক অবস্থান ও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন ঘাঁটি। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাতটি আর বিচ্ছিন্ন আক্রমণে সীমাবদ্ধ নেই, বরং একটি ধারাবাহিক সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে এগোচ্ছে।
অন্যদিকে, এই সামরিক উত্তেজনার মাঝেই কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রে লেবানন ও ইসরাইলের প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক। এই বৈঠককে কেন্দ্র করে লেবাননের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। হিজবুল্লাহসহ দেশটির কয়েকটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই বৈঠককে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে।
হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যে বলা হয়েছে, ইসরাইলের সঙ্গে কোনো ধরনের সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনা বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের মতে, চলমান হামলা বন্ধ না করে আলোচনায় বসা মানে শত্রুপক্ষকে আরও সুযোগ করে দেওয়া। সংগঠনটির একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, ইসরাইল আলোচনার আড়ালে লেবাননের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টি করতে চাইছে।
বিশেষ করে সংগঠনটির এক শীর্ষ নেতা উল্লেখ করেছেন, ইসরাইলের কৌশল হলো রাজনৈতিক চাপ ও সামরিক উত্তেজনা একসঙ্গে ব্যবহার করে লেবাননের ভেতরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা। তাদের দাবি, এই ধরনের বৈঠক দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হতে পারে এবং এতে জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লেবাননের আরেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল আমাল মুভমেন্টও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বলেছে, ইসরাইলের সঙ্গে গোপন বৈঠক দেশের স্বার্থের পরিপন্থী এবং এটি জনগণের অনুভূতির বিরুদ্ধে যায়। তাদের মতে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এমন সংবেদনশীল বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।
এদিকে, সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি সংঘর্ষ দ্রুতই বহুমাত্রিক রূপ নিতে পারে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ক্রুজ মিসাইলের মতো উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানো হলে তা প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ভবিষ্যতে এই ধরনের হামলা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা লেবাননের অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একইসঙ্গে তারা স্পষ্ট করেছে, ইসরাইলি আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই। তাদের শর্ত অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ, দখলদার বাহিনীর প্রত্যাহার এবং বন্দিদের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। একদিকে চলমান সামরিক অভিযান, অন্যদিকে কূটনৈতিক টানাপোড়েন—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়।
মন্তব্য করুন