
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান-ইসরায়েল পরিস্থিতি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দখলদার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি যে কোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। তার এই মন্তব্য নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেতানিয়াহু এ বিষয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক এবং সামান্য কারণেই উত্তেজনা আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তার ভাষায়, যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর থাকলেও এটি স্থিতিশীল নয় এবং যেকোনো সময় এর অবসান ঘটতে পারে।
বৈঠকে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের প্রতিও সমর্থন জানান। বিশেষ করে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপের ঘোষণাকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, এই ধরনের চাপ ইরানকে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্কের কোনো অবনতি হয়নি। বরং দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট JD Vance-এর সঙ্গে সাম্প্রতিক যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেন। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার পর ভ্যান্স তাকে পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন বলে জানান তিনি।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক হামলা বন্ধ রাখবে এবং এর বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। এই প্রণালি বিশ্ববাণিজ্য, বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। কিন্তু ইরান সেই শর্ত পূরণ করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়নি।
এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি ছিল—ইরান যেন তাদের সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণভাবে দেশ থেকে সরিয়ে নেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ রাখে। এই বিষয়টি ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে, এই কর্মসূচির আড়ালে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে কি না—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। একদিকে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও অন্যদিকে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং অভিযোগ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি উভয় পক্ষ সংযম না দেখায়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুতই আবারও সহিংসতার দিকে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও পড়তে পারে। বিশেষ করে তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, ইরান-ইসরায়েল পরিস্থিতি এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও তা অত্যন্ত ভঙ্গুর। নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই উত্তেজনা কমাতে সক্ষম হয় কিনা, নাকি আবারও মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়।
মন্তব্য করুন