
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেছে। এই বহুল আলোচিত মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মামলার অন্যান্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আদালতে দীর্ঘ সময় ধরে রায়ের বিভিন্ন অংশ পাঠ করা হয় এবং প্রতিটি আসামির দায় ও শাস্তি পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়।
রায়ে বলা হয়, মামলার প্রধান দুই আসামি রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত মনে করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং তারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।
এছাড়া মামলায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন— সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব। আদালত তাদের অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে এই শাস্তি প্রদান করে।
মামলায় আরও পাঁচজনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এবং ছাত্রসংগঠনের নেতারা। আদালত তাদের বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় এই সাজা ঘোষণা করে।
এছাড়া আটজন আসামিকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্রসংগঠনের নেতারা রয়েছেন। অপরদিকে, আরও ১১ জনকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যারা বিভিন্নভাবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে আদালত মনে করেছে।
একই সঙ্গে একজন আসামির ক্ষেত্রে আদালত তার পূর্বে ভোগ করা হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে ওই আসামির আর নতুন করে কারাভোগ করতে হবে না।
মামলার শুনানিকালে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। মোট ২৫ জন সাক্ষী এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিন, যিনি মামলার প্রতিটি আসামির বিরুদ্ধে পৃথকভাবে দায়ের বিবরণ আদালতে তুলে ধরেন। তার সাক্ষ্যে উঠে আসে, কীভাবে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং কার কী ভূমিকা ছিল।
এছাড়া আলোচিত এই মামলায় ‘তারকা সাক্ষী’ হিসেবে জবানবন্দি দেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক এবং বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তার বক্তব্য মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মামলার ৩০ জন আসামির মধ্যে ছয়জন বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন— এএসআই আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, ছাত্রনেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল এবং আনোয়ার পারভেজ। রায় ঘোষণার সময় তাদের আদালতে হাজির করা হয়। বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ৫ মার্চ এই মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং যুক্তিতর্ক শেষে আদালত এই রায় প্রদান করে। পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি দেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগ আবারও প্রমাণ করল যে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। অপরাধী যেই হোক না কেন, তার বিচার নিশ্চিত করা হবে—এই বার্তাই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে এই রায়ে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রায় ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে এটি ভুক্তভোগীদের পরিবার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা আরও বাড়াবে।
সব মিলিয়ে, আবু সাঈদ হত্যা মামলার এই রায় দেশের বিচার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ
মন্তব্য করুন