
বাংলাদেশ থেকে হজ পালন করতে যাওয়া মুসল্লিদের জন্য সুখবর দিয়েছে সরকার। হজের সামগ্রিক ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিমানভাড়া কমানোর পরিকল্পনা। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রাশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, আগামী বছরে হজযাত্রীদের বিমানভাড়া কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান। দেশের অন্যতম বেসরকারি লিড এজেন্সি আমিন ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের উদ্যোগে এবং সৌদি আরবের রাওয়াফ মিনা এজেন্সির সহযোগিতায় হজযাত্রীদের মধ্যে নুসুক কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে এই ঘোষণা দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও আধুনিক করতে কাজ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিমানভাড়া নির্ধারণে এমন নীতি অনুসরণ করা হবে যাতে যাত্রীদের কাছ থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া না হয়। সর্বনিম্ন প্রয়োজনীয় খরচেই ভাড়া নির্ধারণ করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে হজ পালনের সুযোগ পায়।
তিনি আরও জানান, হজ ব্যবস্থাপনার সার্বিক উন্নয়নের জন্য সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী হজ ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো হজ এজেন্সি যদি যাত্রীদের যথাযথ সেবা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। একইভাবে দায়িত্বে অবহেলা করলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, হজযাত্রীদের সেবা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে বিমান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের কাজ হবে হজযাত্রীদের যাত্রা থেকে শুরু করে সৌদি আরবে অবস্থানকালীন বিভিন্ন বিষয়ে সহায়তা করা। কেউ দায়িত্বে অবহেলা করলে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও থাকবে।
এবারের হজ ব্যবস্থাপনায় একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে ‘নুসুক কার্ড’ বিতরণ ব্যবস্থা। প্রতিমন্ত্রী জানান, এই প্রথমবারের মতো হজযাত্রীরা দেশেই বসে নুসুক কার্ড হাতে পাচ্ছেন। এটি একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র, যা হজের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদি আমিন এই উদ্যোগকে হজ ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের ভেতরেই নুসুক কার্ড বিতরণ হজ ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও সহজতর করবে। এর মাধ্যমে যাত্রীরা আগেই প্রস্তুতি নিতে পারবেন এবং সৌদি আরবে গিয়ে ভোগান্তি কমবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার ভবিষ্যতে হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও উন্নত, সুশৃঙ্খল ও হাজি-বান্ধব করতে কাজ করছে। ধর্মীয় এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালনে যেন কেউ আর্থিক বা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার মুখোমুখি না হন, সে বিষয়ে সরকার আন্তরিক।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সংসদ সদস্য শামীম কায়সার বলেন, বর্তমান সরকার খুব অল্প সময়ের মধ্যে হজের প্রস্তুতি নিয়েছে। তারপরও একটি সুশৃঙ্খল ও উন্নত হজ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এবার হজযাত্রীরা ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন।
তিনি আরও জানান, সৌদি আরবে বাংলাদেশি হজ মিশনের অফিসগুলোতে যাত্রীরা প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা পাবেন। এসব অফিসে সহায়তা পাওয়ার মাধ্যমে হজযাত্রীরা নানা সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে পারবেন।
হজ এজেন্সিগুলোর সংগঠন হাব-এর মহাসচিব ফরিদ আহমদ মজুমদার নুসুক কার্ডের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই কার্ড ছাড়া হজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরা হয়রানির শিকারও হতে পারেন। তাই এই কার্ডটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আগেভাগে কার্ড বিতরণ করার ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। অনেক যাত্রী অসাবধানতাবশত কার্ড হারিয়ে ফেলতে পারেন বা দেশে রেখে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে নতুন করে কার্ড সংগ্রহ করা সম্ভব নাও হতে পারে। এজন্য তিনি যাত্রার আগে বিমানেই কার্ড বিতরণের বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দেন।
অনুষ্ঠানে আমিন ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের মাধ্যমে হজে যাওয়া ১৪টি এজেন্সির যাত্রীদের মধ্যে নুসুক কার্ড বিতরণ করা হয়। এ উদ্যোগের ফলে যাত্রীরা আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারছেন এবং এতে তাদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সরকার হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী করতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। বিমানভাড়া কমানোর পরিকল্পনা, সেবার মান নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ, এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে হজযাত্রা আরও সহজ ও আরামদায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মন্তব্য করুন