
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ডা. শফিকুর রহমান, যিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর আমির এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেছেন, দেশের নীতিনির্ধারণে ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব থেকে এখনো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি বাংলাদেশ।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ-এ অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের কৃষিতে বিশ্ব জ্বালানি সংকটের প্রভাব: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারটি মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব কীভাবে দেশের কৃষি খাতে পড়ছে এবং তা থেকে উত্তরণের পথ কী হতে পারে—সেই বিষয়কে কেন্দ্র করেই আয়োজন করা হয়।
বক্তব্যের শুরুতেই ডা. শফিকুর রহমান দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় যেসব স্লোগান বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। তিনি বলেন, নীতিগত অবস্থান ও বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে এই ফাঁক দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক প্রভাবের বাইরে নিজস্ব নীতিতে পরিচালিত হতে পারছে না, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক লক্ষণ নয়।
তিনি আরও বলেন, সমাজব্যবস্থায় একটি ধরনের ‘গোজামিল’ বা অসামঞ্জস্য বিরাজ করছে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়ার প্রবণতা বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। তার ভাষায়, একটি জাতি যদি নিজের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করে সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে একই সমস্যা বারবার ফিরে আসবে। তিনি একটি নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরে বলেন, অন্যায়ের ফল একসময় ফিরে আসে এবং কেউই এর বাইরে থাকতে পারে না।
জ্বালানি খাতের সংকট প্রসঙ্গে তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, সরকারি বক্তব্যে দেশের অবস্থা অনেক সময় স্বচ্ছল বলে উপস্থাপন করা হয়, যেন দেশ তেলের ওপর ভাসছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার দাবি, দেশের জ্বালানি সংকটের পেছনে রাজনৈতিক সিন্ডিকেট একটি বড় ভূমিকা রাখছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষকে এর মূল্য দিতে হয়।
তিনি মনে করেন, জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা সরাসরি দেশের কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কারণ কৃষি কার্যক্রমে সেচ, পরিবহন এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার অনেকাংশই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
ডা. শফিকুর রহমান কৃষির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে”—এই বিষয়টি কখনো ভুলে গেলে চলবে না। তার মতে, একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষকদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের সহায়তায় কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষকে তার প্রাপ্য দেওয়া এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। তিনি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন, মানুষ যদি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে এবং নৈতিকতা বজায় রাখে, তাহলে সামগ্রিকভাবে দেশের অবস্থার উন্নতি সম্ভব।
সেমিনারে উপস্থিত অন্যান্য বক্তারাও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। তারা বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন খরচ কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, সেমিনারটি দেশের বর্তমান বাস্তবতায় কৃষি ও জ্বালানি খাতের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং চ্যালেঞ্জগুলো নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে যেমন রাজনৈতিক ও নৈতিক দিক উঠে এসেছে, তেমনি অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলনও স্পষ্ট হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্রভাব, জ্বালানি সংকট এবং কৃষি খাতের ভবিষ্যৎ—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য শুধু নীতিনির্ধারণ নয়, তার সঠিক বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রভাবের মধ্যে থেকেও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তবেই একটি টেকসই ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
মন্তব্য করুন