
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। দলটি ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান নিয়ে কড়া সমালোচনা করে তাদের ‘নীতিগতভাবে সংস্কারবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিদ্যমান সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছে দলটি।
বুধবার রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ এসব কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক বর্তমানে চলছে, তা প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়াল করার একটি কৌশল মাত্র। জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে ইচ্ছাকৃতভাবে এসব বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে নাঈম আহমাদ বলেন, সরকার এবং বিরোধী দল—উভয় পক্ষের মধ্যেই সংস্কারবিরোধী প্রবণতা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, যা দেশের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও মীমাংসিত বিষয় পুনরায় সংসদে তোলা হচ্ছে এবং তা নিয়ে অযৌক্তিক বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে জ্বালানি সংকট, কৃষি খাতের সম্ভাব্য বিপর্যয়সহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলো থেকে জনগণের মনোযোগ সরে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি উৎপাদন টেকসই রাখা। কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষা করে রাজনৈতিক অঙ্গনে অপ্রয়োজনীয় আলোচনার মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে হকার উচ্ছেদের মতো পদক্ষেপও জনদৃষ্টি ভিন্ন খাতে নিতে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জেডিপির আহ্বায়ক মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সম্ভব নয়। বরং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং গণপ্রতিরোধের মাধ্যমেই প্রকৃত পরিবর্তন অর্জন করা সম্ভব। তিনি বলেন, অতীতে দেশের বিভিন্ন আন্দোলনে দেখা গেছে, জনসম্পৃক্ততা ছাড়া বড় কোনো পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তাই জনগণকে সচেতন হতে হবে এবং সংস্কারের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে।
নাঈম আহমাদ অভিযোগ করেন, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজেদের সংস্কারপন্থি হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে তাদের কর্মকাণ্ডে সেই প্রতিফলন দেখা যায় না। তিনি বলেন, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, তারা নীতিগতভাবে সংস্কারের পক্ষে নয়। ফলে জনগণের সামনে একটি বিভ্রান্তিকর চিত্র তৈরি হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের জ্বালানি খাত নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। জেডিপির পক্ষ থেকে বলা হয়, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে। বিশেষ করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জ্বালানি বিতরণে অসংগতি তৈরি হচ্ছে, যা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এই ক্ষেত্রে সরকারদলীয় কিছু নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা, তা তদন্ত করার দাবি জানানো হয়।
জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে তা দেশের কৃষি উৎপাদনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে ডিজেল সংকটের কারণে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হলে খাদ্য উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং এর ফলে খাদ্যঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
কৃষি খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে সার সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের পাঁচটি সরকারি সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে চারটিই বন্ধ রয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর ফলে কৃষকরা সময়মতো প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
জেডিপির নেতারা মনে করেন, কৃষি খাতকে সুরক্ষিত রাখতে হলে কৃষকদের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে সার ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কৃষি উপকরণের দাম সহনীয় রাখতে হবে, যাতে কৃষকরা উৎপাদনে উৎসাহিত হন। অন্যথায় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে জেডিপি কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে ডিজেল ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবিতে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। দলটি আগামী ১০ এপ্রিল বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে বলে জানিয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাবে।
সংবাদ সম্মেলনে জেডিপির অন্যান্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন এবং তারা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন দলের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল আলিম, প্রধান সংগঠক মো. আহছান উল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইমরান হোসেন রাহাত, যুগ্ম আহ্বায়ক মুত্তাকী বিন মনির, সাদমান আলম, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব নূরা জেরিন এবং যুগ্ম সদস্য সচিব মাহতাব হোসেন সাব্বিরসহ আরও অনেকে।
তারা সবাই একমত পোষণ করেন যে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন বাস্তবমুখী ও কার্যকর পদক্ষেপ। শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সংকট সমাধান সম্ভব নয়। বরং জনগণের অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ।
সবশেষে জেডিপির পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং সংস্কারমুখী রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি জনগণের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। গণপ্রতিরোধের মাধ্যমে জনগণ যদি তাদের দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করে দলটি।
মন্তব্য করুন