রাজধানীজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, এমনকি রাতভর দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পাওয়ার ঘটনা—সব মিলিয়ে ভোগান্তির এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই সংকট শুধু পরিবহন ব্যবস্থাকেই ব্যাহত করছে না, বরং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতেও সরাসরি চাপ তৈরি করছে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ সারি লেগেই আছে। অনেক চালক রাত ১০টা বা তারও আগে এসে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, আবার কেউ ভোরে এসে দেখছেন তার আগেই শতাধিক মোটরসাইকেল লাইনে অপেক্ষমাণ। তেলের জন্য এই দীর্ঘ অপেক্ষা যেন এখন নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে।
মিজানুর রহমান, পেশায় মাদরাসার শিক্ষক ও ইমাম—তার গল্পটি এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিনই তাকে মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু টানা তিনদিন চেষ্টা করেও তিনি তেল সংগ্রহ করতে পারেননি। এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরে অবশেষে তিনি লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হন। রাত ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে মোটরসাইকেল রেখেই বাসায় ফিরে যেতে হয় তাকে। পরদিন আবার এসে দেখেন, তার বাইকটি লাইনের বাইরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। নতুন করে লাইনে দাঁড়ানো ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।
মিজানুর রহমানের মতোই হাজারো মানুষ এখন এই সংকটের মুখোমুখি। কেউ চাকরি, কেউ ব্যবসা, আবার কেউ রাইড শেয়ারিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাদের কাছে মোটরসাইকেল বা গাড়ি শুধু বাহন নয়—জীবিকার প্রধান মাধ্যম। ফলে তেল না পেলে তাদের আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই বলছেন, আগে লাইনে দাঁড়িয়ে কিছুটা সময় অপেক্ষা করলে তেল পাওয়া যেত। কিন্তু এখন দিন পার হয়ে যায়, রাত কাটে—তবুও তেলের নিশ্চয়তা নেই।
রতন সরকার নামের আরেক চালক জানান, ভোর ৫টার দিকে পাম্পে এলেও তার সামনে তখন শতাধিক মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে ছিল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও তিনি নিশ্চিত নন যে তেল পাবেন কি না। এই অনিশ্চয়তা মানসিক চাপও বাড়িয়ে দিচ্ছে চালকদের মধ্যে।
জ্বালানি সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাম্প মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরবরাহের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি। যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৮ হাজার লিটার তেলের চাহিদা, সেখানে সরবরাহ আসছে মাত্র ৯ হাজার লিটার। ফলে অর্ধেক চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই ঘাটতির কারণে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে, আর তেল শেষ হয়ে গেলে পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া বিকল্প থাকছে না।
তবে শুধু সরবরাহ ঘাটতিই নয়, বাজারে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগও উঠছে। অনেক চালকের দাবি, পাম্প থেকে আড়ালে তেল সরিয়ে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। যেখানে সরকার নির্ধারিত দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে বাইরে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে নিম্নআয়ের মানুষ আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
রাইড শেয়ারিং চালক হাসান আলী বলেন, তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করলে আয় করার সুযোগ কমে যায়। প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি। তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেকেই পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হবেন।
পাম্প কর্তৃপক্ষও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। নিরাপত্তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যক্তি জোর করে লাইনে ঢুকে পড়ছেন বা একাধিকবার তেল নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে এবং সাধারণ চালকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
এই সংকটের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৃহত্তর অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। পরিবহন খরচ বাড়লে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়, যার ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় উৎপাদনশীলতাও কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। পাশাপাশি বাজার মনিটরিং জোরদার করা, অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নইলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তাদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই, ফলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায়ও নেই। এই বাস্তবতা শুধু একটি জ্বালানি সংকটের গল্প নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জ্বালানি তেলের এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে তা দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এখন প্রয়োজন দ্রুত, কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ—যাতে মানুষকে আর রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে মৌলিক একটি প্রয়োজন মেটাতে না হয়।