
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তরুণ আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল (২৮) হত্যাকাণ্ডের পেছনে পূর্ব শত্রুতা ও আর্থিক লেনদেনকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ঘটনার তদন্তে নেমে ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ইবনে মিজান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযুক্তদের শনাক্ত করে প্রথমে মোহাম্মদপুর ও আশপাশ এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পরবর্তীতে ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত মূল পরিকল্পনাকারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন—আকতার হোসেন (৪৫), মো. মুন্না (২৪), মিরাজ ফকির (২২) এবং নয়ন ওরফে খোকন (২৪)। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি সুইচ গিয়ার (ধারালো অস্ত্র) এবং একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে, যা ঘটনার সময় ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, নিহত আসাদুল হক এবং গ্রেপ্তার হওয়া আকতার হোসেনের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ছিল। কিছুদিন আগে তাদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে এবং সেই ঘটনায় আকতার আসাদুলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় আসাদুল গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন কারাভোগও করেন। পরে জামিনে বের হয়ে আসার পর দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
এছাড়া তাদের মধ্যে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধও ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এই দুই বিষয়কে কেন্দ্র করেই পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে বলে ধারণা পুলিশের। ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে আকতার তার সহযোগীদের নিয়ে পরিকল্পনা করে আসাদুলকে মধ্যরাতে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে নির্জন স্থানে নিয়ে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়।
পুলিশের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। অভিযুক্তরা আগে থেকেই অস্ত্র প্রস্তুত রেখেছিল এবং মোটরসাইকেল ব্যবহার করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ঘটনার পর তারা ঢাকার বাইরে গিয়ে আত্মগোপনে ছিল। পরবর্তীতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঘটনার পর নিহতের চাচাতো বোন বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং তাদের কাছ থেকে আরও তথ্য আদায়ের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে আরও জানা গেছে, নিহত আসাদুল হকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ছিল। পুলিশের তথ্যমতে, তার নামে মোট ছয়টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে চারটি মাদক সংক্রান্ত। এছাড়া দ্রুত বিচার আইনে একটি এবং অন্য একটি সাধারণ মামলা রয়েছে। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া মুন্নার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা, মিরাজের বিরুদ্ধে একটি এবং নয়নের বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে। তবে আকতার হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো মামলা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে একই ঘটনায় র্যাব-২ আলাদাভাবে অভিযান চালিয়ে আরও দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন আসাদুল ইসলাম ও মো. শাওন। তাদের মোহাম্মদপুরের মেট্রো হাউজিং এলাকা থেকে আটক করা হয়। ফলে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ডিসি ইবনে মিজান বলেন, তেজগাঁও বিভাগের অধীনে থাকা থানাগুলোর মধ্যে মোহাম্মদপুর অন্যতম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। রায়েরবাজার, বসিলা, ঢাকা উদ্যান ও চাঁদ উদ্যানসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিতভাবে অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক এই ঘটনায় দেখা গেছে, বাইরে থেকে কিছু সন্ত্রাসী এসে অপরাধ সংঘটিত করে আবার অন্যত্র পালিয়ে গেছে। এ কারণে পুলিশের নজরদারি আরও বাড়ানো হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট জোরদার করা হবে, যাতে বাইরে থেকে এসে কেউ অপরাধ করে পালিয়ে যেতে না পারে।
গ্রেপ্তারকৃতদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আকতার হোসেনের কিছু রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং নিশ্চিত হওয়ার পর বিস্তারিত জানানো হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৬ এপ্রিল দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বেড়িবাঁধ এলাকায় সাদেক খানের ইটখোলার কাছে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। নিহত আসাদুল হক বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কালনা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি পরিবারসহ ঢাকার মোহাম্মদপুরের মেট্রো হাউজিং এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
এই ঘটনাটি রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও আর্থিক বিরোধ থেকে এমন সহিংস অপরাধের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ বলছে, তদন্ত চলমান রয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
সব মিলিয়ে, আসাদুল হক হত্যাকাণ্ডটি শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত বিরোধের ঘটনা নয়, বরং এটি শহরের অপরাধ প্রবণতা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের একটি প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়, তদন্তের মাধ্যমে পুরো চক্রকে কত দ্রুত আইনের আওতায় আনা যায় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মন্তব্য করুন