
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেশটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বস্তির বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে এর তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জানান, লেবাননে যুদ্ধবিরতি চলাকালীন হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ করতে হবে, যা ইরানের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে। তার এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘোষণার পরপরই তেলের দাম ১১ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকাংশে কমে আসার ফলেই এই মূল্যহ্রাস ঘটেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এবং গ্যাস এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালির নিরাপত্তা বা চলাচল ব্যাহত হলে তা সরাসরি বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলে। অতীতে একাধিকবার এই প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার নজির রয়েছে।
ইরানের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রও। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে ইরানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক বার্তাও দিয়েছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে একটি স্থায়ী ও কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানো না পর্যন্ত দেশটির বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ বহাল থাকবে। এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, পরিস্থিতি আপাতত কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আঞ্চলিক উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
এর আগে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হিজবুল্লাহ ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় লেবাননের পরিস্থিতি ইরানের কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ হওয়া এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়াই ইরানের এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ। এর আগে গত ৭ এপ্রিল ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দিলেও বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় হরমুজ প্রণালির ব্যবহার সীমিত রাখা হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সিদ্ধান্তকে অনেকেই একটি কৌশলগত নমনীয়তা হিসেবে দেখছেন। এটি একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার একটি উপায়, অন্যদিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব আরও বেশি। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তেলের দাম কমে আসায় আমদানিনির্ভর দেশগুলো কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে, বিশেষ করে যেসব দেশের অর্থনীতি জ্বালানি ব্যয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই স্বস্তি স্থায়ী হবে কিনা তা নির্ভর করছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। যদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায় বা নতুন করে সংঘাত শুরু হয়, তাহলে আবারও হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং তেলের বাজারে অস্থিরতা ফিরে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের এই পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে এর ফলাফল নির্ভর করবে কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর। আপাতত এই সিদ্ধান্তকে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল, যা হয়তো ভবিষ্যতে আরও বড় সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে।
মন্তব্য করুন