
রাজধানীতে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সম্মেলনে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, টিকাদান কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, অতীতের অবহেলা দেশের জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং বিশেষ করে হামের টিকা সময়মতো না দেওয়াকে তিনি “ক্ষমাহীন অপরাধ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং নীতিনির্ধারকরা এ সম্মেলনে অংশ নেন।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্যখাতে বৈষম্য কমিয়ে আনা এবং জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের ফলে অনেক শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে অতীতের ব্যর্থতার প্রসঙ্গে তিনি কঠোর অবস্থান নেন। তারেক রহমান বলেন, “যথাসময়ে টিকা না দেওয়ার কারণে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ এত বড় আকার ধারণ করেছে। বিগত দুটি সরকার এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তার এই মন্তব্যকে অনেকেই রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি যাতে না তৈরি হয়, সে জন্য প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। “প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর”—এই নীতিকে সামনে রেখে স্বাস্থ্যখাত পরিচালনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করাই হবে সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন ন্যায্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পায়, সে জন্য একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ধীরে ধীরে বাড়ানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকার জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এর মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন, জনবল বৃদ্ধি এবং সেবার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে পূর্ণাঙ্গ মাতৃত্ব ও শিশুস্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। এতে করে গ্রামাঞ্চলের মানুষও উন্নত চিকিৎসাসেবা সহজেই পাবে এবং শহরের ওপর চাপ কমবে।
স্বাস্থ্যখাতের জনবল সংকট দূর করতে বড় আকারের নিয়োগ পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, প্রায় এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী হবে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সেবা আরও সহজলভ্য হবে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
এ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ও যুগোপযোগী করে তোলা। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাতচন্দ্র বিশ্বাস, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মাঠপর্যায়ের সফলতা তুলে ধরা। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত শ্রেষ্ঠ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এতে স্বাস্থ্যখাতে কাজ করা কর্মকর্তাদের মধ্যে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, এই সম্মেলন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন ছিল না; বরং দেশের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, অতীতের ভুল এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। বিশেষ করে হামের টিকা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বক্তব্য বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জোর দেওয়া এবং টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, সঠিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।
সবশেষে বলা যায়, স্বাস্থ্যখাতে সরকারের ঘোষিত এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে বাস্তব ফল পেতে হলে ঘোষণার পাশাপাশি কার্যকর পদক্ষেপই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
মন্তব্য করুন